সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে প্রায় তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা আজও তাড়া করে ফেরে সাতক্ষীরার বনজীবী জিয়ারুল গাজীকে। বাঘের মুখ থেকে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর বাবা জিন্নাহ গাজী।
ঘটনাটি ১৯৯৬ সালের। তখন জিয়ারুলের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। জীবিকার সন্ধানে পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ একটি বাঘ তাঁকে আক্রমণ করে জঙ্গলের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। ছেলের চিৎকার শুনে মুহূর্তের মধ্যে খালি হাতে বাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন বাবা জিন্নাহ গাজী।
জিয়ারুলের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে বাঘের সঙ্গে লড়াই করেন তাঁর বাবা। একপর্যায়ে বাঘ তাঁকে ছেড়ে জিন্নাহ গাজীর ওপর আক্রমণ চালায়। প্রাণপণ প্রতিরোধের পরও শেষ পর্যন্ত বাঘের সঙ্গে সেই অসম যুদ্ধে হার মানতে হয় তাঁকে। পরে বাঘ তাঁর বাবাকে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় জিয়ারুলও গুরুতর আহত হন।
সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় ৩০ বছর। কিন্তু সেই দিনের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট জিয়ারুলের মনে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আজও বাঘের আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন বহন করছেন তিনি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনিমোখা গ্রামের বাসিন্দা জিয়ারুল বর্তমানে পেশায় বনজীবী। মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ এবং মধু আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবারের মতো তাঁর জীবনও জড়িয়ে আছে বনকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে।
বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় সুন্দরবনে যাওয়া বন্ধ রেখেছিলেন জিয়ারুল। তবে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে আবারও ফিরে যেতে হয়েছে সেই বনেই। তিনি বলেন, এলাকায় কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জীবিকার জন্য ঝুঁকি নিয়েই সুন্দরবনে যেতে হয়।
জিয়ারুলের আত্মীয় আকলিমা খাতুন জানান, বাঘের আক্রমণের পর দীর্ঘদিন তিনি জিয়ারুলের দেখাশোনা করেছেন। তাঁর মতে, ভয়াবহ সেই ঘটনার ক্ষত আজও বহন করছেন জিয়ারুল।
বর্তমানে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার জিয়ারুলের। নিজের কোনো জমিজমা নেই। জীবিকার সংগ্রামের পাশাপাশি তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় নানা ঝুঁকিও। তাঁর অভিযোগ, সুন্দরবনে যেতে অনেক সময় বনদস্যুদের চাপ ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। গত বছরও তিনি তাদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন।
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন জিয়ারুল। তাঁর আক্ষেপ, সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের কষ্ট ও সংগ্রামের কথা খুব কম মানুষই জানতে চায়। তবু পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিনই নতুন করে লড়াই করে যেতে হয় তাঁদের।
