আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। চারদিকে উৎসবের আমেজ। কারও বাসায় চলছে অতিথি আপ্যায়ন, গরুর মাংস ভাগাভাগি। আবার শহরের অন্য প্রান্তে কেউ হিসাব কষছেন, আধা কেজি মাংস কিনলে সন্তানের মুখে অন্তত একদিনের হাসি ফোটানো যাবে কি না। রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থান রোডে বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেল ঠিক এমনই এক বেদনাময় অথচ জীবন্ত বাস্তবতা। ঈদের দিনে সেখানে বসেছে অস্থায়ী ‘মাংসের হাট’; যা মূলত গরিব, নিম্নবিত্ত আর কুরবানি দিতে না পারা মধ্যবিত্ত মানুষের শেষ ভরসা।
রাস্তার দুই পাশে মাটিতে চাটাই বিছিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। কারও সামনে খাটিয়া, হাতে ধারালো চাপাতি, পাশে ওজন মাপার দাঁড়িপাল্লা। চাটাইয়ের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে মাথা, জিভ, লেজ, সিনা, রান, গর্দান, চর্বি, হাড্ডি আর ছাট গোশত। কাঁচা মাংসের গন্ধে ভারী চারপাশ। কেউ দাম হাঁকছেন, কেউ দরদাম করছেন, আবার কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, হাতে মাত্র কয়েকশ টাকা, চোখে পরিবারের জন্য একবেলার মাংস কেনার আকুতি।
খুলনার ডুমুরিয়া থেকে আসা রিফাত কসাই সকাল থেকে বিভিন্ন বাড়িতে গরু কাটার কাজ করেছেন। কাজের বিনিময়ে পাওয়া মাংস সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় বিক্রি করছেন এখানে। তিনি বলেন, ‘আমরা গরু কাটি, মাংস পাই। কিন্তু রাখার ফ্রিজ নাই। নিজেরা একটু খাই, বাকিটা বিক্রি করি। যারা কিনতে আসে তাদের অবস্থা দেখলে মায়া লাগে। অনেকে লজ্জায় দামও বলতে পারে না।’
পাশে বসা ফয়জুল কসাই জানান, তিনি ও মফিজ সারা দিন লালবাগ, আজিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি গরু কেটেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ আসে, কইতে পারে না যে তারা গরিব। শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চুপ করে থাকে। তখন বুঝি। আমরা কম দামে দিই। এই ঈদের দিনেও কত মানুষের ঘরে মাংস ওঠে না।’
বগুড়া থেকে আসা কসাই আবদুল মালেক বলেন, ‘আমরা চেহারা দেখেই বুঝি কার অবস্থা কেমন। রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালক, দিনমজুর… অনেকে আসে। কেউ ২০০ টাকার মাংস নেয়, কেউ ১০০ টাকার চর্বি। কিন্তু তাদের চোখে যে আনন্দ দেখি, সেটা বড়লোকদের হাজার কেজি মাংসেও নাই।’
ক্রেতাদের গল্পগুলো আরও মর্মস্পর্শী। লালবাগের আমলিগোলা থেকে মেয়ে তানিয়াকে নিয়ে এসেছেন রহিমা বেগম। স্বামী কারখানায় কাজ করেন। বাড়িভাড়া, বাজার আর ছেলের স্কুলের খরচ চালিয়ে কুরবানি দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মেয়েটি কয়েক দিন ধরে গরুর মাংস খেতে চাইছিল। চোখ মুছতে মুছতে রহিমা বলেন, ‘মেয়েটা পাশের বাসায় মাংস রান্না দেখেছে। এসে বলছিল, ‘আম্মু, আমরাও কি গরুর মাংস খাব না?’ তখন বুকটা ভেঙে গেছে। তাই ধার করে এখানে এসেছি।’
মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট তানিয়া বলল, ‘আম্মু বলেছে আজ মাংস রান্না হবে।’
কামরাঙ্গীরচর থেকে আসা অটোরিকশাচালক মানিক শরীফ তিন কেজি ছাট মাংস কিনেছেন। সঙ্গে মেয়ে আর ছোট নাতি। বৃদ্ধ চোখে ক্লান্তি, মুখে চাপা কষ্ট। তিনি বলেন, ‘সারাবছর মানুষ নামাই, ভাড়া চালাই। নিজের ঘরে ঈদের দিন মাংস নাই—এটা খুব কষ্টের। নাতিটা সকালে বলেছে, দাদা আজ মাংস খাব। তাই এখানে এলাম।’
রিকশাচালক জসিম উদ্দিনের হাতে ছোট্ট একটি পলিথিন ব্যাগ—ভেতরে আধা কেজি হাড্ডি আর কিছু চর্বি। তিনি বলেন, ‘বাসায় তিনটা বাচ্চা। বড় ছেলে বলেছে, আব্বা অন্যদের বাসায় এত মাংস, আমাদের বাসায় নাই কেন? ওই কথা শুনে আর থাকতে পারিনি। তাই ২০০ টাকার মাংস কিনলাম।’
আজিমপুরের বাসিন্দা সালমা খাতুন এসেছেন বৃদ্ধ মাকে নিয়ে। স্বামী অসুস্থ, মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চলে। তিনি বলেন, ‘বছরে একটা দিন মাংস না খেলে বাচ্চারা মন খারাপ করে। বড়লোকরা কত মাংস ফ্রিজে রাখে, আর আমরা আধা কেজি কিনতে গিয়েও চিন্তা করি।’
এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ ভ্যানচালক রফিক মিয়া। হাতে মাত্র ১৫০ টাকা। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষে কিছু চর্বি আর হাড্ডি কিনলেন। কাঁপা গলায় বললেন, ‘নাতনিটা বলেছে, দাদা একটু মাংস আনো। খালি হাতে যেতে পারলাম না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী বলেন, ‘আমরা না পারি কুরবানি দিতে, না পারি কারও কাছে চাইতে। এই বাজারটা আমাদের মতো মানুষের জন্য আশীর্বাদ।’
বিক্রেতারাও জানান, অনেক মানুষ মুখ নিচু করে আসেন, দরদাম করতে পারেন না, সন্তানের হাত ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন অনেক বিক্রেতাই নিজেই দাম কমিয়ে দেন। এক বিক্রেতার কথায়, ‘এই বাজারে শুধু মাংস বিক্রি হয় না। এখানে মানুষের কষ্ট বিক্রি হয়, লজ্জা বিক্রি হয়, আবার সামান্য আনন্দও বিক্রি হয়।’
দিন গড়ানোর সঙ্গে আজিমপুর কবরস্থান রোডের ভিড় আরও বাড়তে থাকে। কারও হাতে আধা কেজি মাংস, কারও হাতে শুধু হাড্ডি আর চর্বি। তবু সেই ছোট্ট ব্যাগটুকুই অনেক পরিবারের কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেকের মুখেই স্বস্তি—আজ অন্তত ঘরে মাংস রান্না হবে।
আজিমপুর কবরস্থান রোডের এই অস্থায়ী মাংসের হাট তাই শুধু একটি বাজার নয়; এটি রাজধানীর নীরব মানুষের কষ্ট, না-পাওয়া আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। কুরবানির ঈদের আনন্দ যখন শহরের অভিজাত ফ্ল্যাটে ফ্রিজভর্তি মাংস আর আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়, তখন এই রাস্তায় ঈদ মানে মাত্র ২০০ টাকার ‘ছাট মাংস, আধা কেজি হাড্ডি কিংবা সামান্য চর্বি নিয়ে বাড়ি ফেরা। এই হাট যেন প্রতি বছর নীরবে মনে করিয়ে দেয়—এই শহরে এখনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা কারও কাছে হাত পাতেন না, কিন্তু অন্তরে লুকিয়ে রাখেন হাজারো কষ্ট। আর সেই কষ্টের মধ্যেও পরিবারের মুখে একদিনের ভালো খাবার তুলে দেওয়ার স্বপ্নটুকু তাঁরা ছাড়েন না।
