চলতি মৌসুমে আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে হজের খরচ নিয়ে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী চিত্র। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিমান ভাড়া ও আবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকটি দেশের সরকার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে হজের ব্যয় রাখার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে কিছু দেশে খরচ বেড়ে যাওয়ায় হজযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হজ ব্যয়ের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
আলজেরিয়া
হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখেছে আলজেরীয় সরকার। গত বছর হজের খরচ ছিল ৮ লাখ ৪০ হাজার দিনার (৬৩২৬ ডলার), আর চলতি বছরেও তা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। সরকার প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য অতিরিক্ত ১ লাখ দিনার (৭৫৩ ডলার) সহায়তা ঘোষণা করায় প্রকৃত ব্যয় ৯ লাখ ২০ হাজার দিনার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ২০ হাজার দিনার (৬১৭৮ ডলার)। এই খরচের মধ্যে বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মরক্কো
মরক্কোতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৩ হাজার মরক্কান দিরহাম, যা প্রায় ৬৮৭৮ ডলারের সমান। তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় খরচ অনেকটাই নির্ভর করছে হোটেলের মান ও হারাম শরিফ থেকে দূরত্বের ওপর। ফলে প্যাকেজভেদে খরচ ৮ হাজার ১৮৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৭ হাজার ৪৬৯ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। যদিও জ্বালানির দাম বেড়েছে, সৌদি আরবে আবাসন খরচ স্থিতিশীল থাকায় মোট ব্যয় তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সিরিয়া
দীর্ঘ ১৩ বছর পর এবার প্রথমবারের মতো আলেপ্পো বিমানবন্দর থেকে হজ ফ্লাইট চালু হয়েছে। এতে দেশটির হজযাত্রীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছর সিরিয়া থেকে প্রায় ২২ হাজার মানুষ হজে যাচ্ছেন। দেশীয় হজযাত্রীদের জন্য খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭৫০ ডলার এবং প্রবাসীদের জন্য ৪৯০০ ডলার। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিশেষ ব্যবস্থায় এবার সিরীয় হাজিদের লাগেজ সরাসরি হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার সুবিধাও রাখা হয়েছে।
লেবানন
লেবাননে এ বছর হজের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সাধারণ প্যাকেজের দাম এখন ৪৫০০ থেকে ৫৫০০ ডলারের মধ্যে। তবে কাবা শরিফের কাছাকাছি হোটেল বেছে নিলে ব্যয় আরও বেড়ে যায়। ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট রুট পরিবর্তন এবং বিমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কাতার
কাতারে হজ প্যাকেজে দেখা গেছে বড় ধরনের বৈচিত্র্য। হারাম শরিফ থেকে দূরের হোটেলগুলোর প্যাকেজ শুরু হচ্ছে ২৩ হাজার কাতারি রিয়াল (৬৩১৯ ডলার) থেকে। অন্যদিকে কাছাকাছি হোটেল ও বাড়তি সুবিধাসম্পন্ন প্যাকেজের খরচ ৩৮ হাজার রিয়াল ছাড়িয়ে বিশেষ ক্ষেত্রে ১ লাখ রিয়াল (২৭ হাজার ৪৭৩ ডলার) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এছাড়া গত বছরের তুলনায় বিমান ভাড়া প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জর্দান
জর্দানে হজের খরচ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। সরকারিভাবে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১৪০ জর্দানীয় দিনার (৪৪২৮ ডলার)। এতে কুরবানি, খাবার, আবাসন ও যাতায়াতের খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এবার অনেক জর্দানীয় হাজি বিমানের পরিবর্তে স্থলপথে সৌদি আরব যাওয়ার দিকে ঝুঁকছেন।
সৌদি আরব (অভ্যন্তরীণ হজযাত্রী)
সৌদি আরবে বসবাসরত নাগরিকদের জন্য অভ্যন্তরীণ হজ প্যাকেজের খরচ গত বছরের মতোই রয়েছে। নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে চারটি প্রধান প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ১৩৩ ডলার থেকে ৩ হাজার ৫০৭ ডলারের মধ্যে। সরকারি তদারকি কঠোর হওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগও কম।
ওমান
ওমানে হজের খরচ বেড়েছে মূলত বিমান ও হোটেল ভাড়া বৃদ্ধির কারণে। বিমানে যাতায়াতসহ হজ প্যাকেজের মূল্য ধরা হয়েছে ২১৩৪ ওমানি রিয়াল (৫৫৪৫ ডলার)। তবে যারা বাস বা স্থলপথে যেতে চান, তাদের জন্য খরচ তুলনামূলক কম— ১৩১৩ রিয়াল (৩৪১২ ডলার)। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশটির হজ প্যাকেজে।
সার্বিক চিত্র
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও অনেক দেশ সরকারি সহায়তা ও আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে হজের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে লেবানন ও ওমানের মতো কিছু দেশে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ হজযাত্রীদের মধ্যে বাড়তি দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে আলজেরিয়া ও জর্দানের মতো দেশগুলো ভর্তুকি ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য হজকে তুলনামূলক সহজ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।
