দেশে চলতি বছরে হামের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭৭ জনে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৬৬৬ জনের, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে ধারণা করা হচ্ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯ জন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৭৭৩ জন এবং উপসর্গজনিত আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯ হাজার ৯০৪ জন।
বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে এটি সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য ও পরিসংখ্যান আলাদাভাবে সংরক্ষণ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (World Health Organization) তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০০৫ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ হাজারের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছিল।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও রোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৪ হাজার ১৮৪ জন। এর মধ্যে ৭০ হাজার ৫০৩ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, ফলে উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৩ জনে। এছাড়া পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া ৯৩ জন রোগীরও মৃত্যু হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে—২৯৭ জন। এরপর রাজশাহী ৮৯ জন, সিলেট ৭৫ জন, চট্টগ্রাম ৫৮ জন, বরিশাল ৫৭ জন, ময়মনসিংহ ৫৫ জন, খুলনা ২৭ জন এবং রংপুরে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো হামের পরবর্তী নিউমোনিয়া। এই নিউমোনিয়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হচ্ছে, ফলে রোগীদের ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকও কার্যকর হচ্ছে না। পাশাপাশি ডায়রিয়া, সেপসিস ও কানের সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লেলিন চৌধুরী জানান, প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও শনাক্তের সংখ্যায় বড় পরিবর্তন নেই, তবে প্রতিদিন কয়েকজনের মৃত্যু পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলছে। তাঁর মতে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, হামের প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে মূলত শিশুরা বেশি আক্রান্ত হলেও এখন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপ সময়মতো নেওয়া হয়নি এবং এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রটোকল প্রকাশ করা হয়নি।
