রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু এই রাগই যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা সম্পর্ক ভাঙে, আমল নষ্ট করে এবং মানুষকে গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। একটি মুহূর্তের রাগ আজীবনের আফসোসে পরিণত হতে পারে।
ইসলাম তাই রাগকে দমন করতে শেখায়— দমন করে শক্তিশালী হতে, নরম হয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে। রাগের মুহূর্তে কী করবেন—সে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের জন্য রেখে গেছে অপূর্ব দিকনির্দেশনা।
কুরআনের আলোকে রাগ সংযম
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের অন্যতম পথ হলো—রাগ দমন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে—আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)
হাদিসের আলোকে রাগের ভয়াবহতা ও করণীয়
রাগ দমন সম্পর্কে নবীজি (সা.) একাধিক হাদিসে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিসের বর্ণনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো—
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জিতে যায়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে— যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, মুসলিম ২৬০৯)
রাগের সময় করণীয়
১️. চুপ থাকা
রাগের সময় বলা কথা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ
‘তোমাদের কেউ রাগ করলে সে যেন চুপ থাকে।’ (মুসনাদ আহমাদ ২১৩৯৮)
২️. অবস্থান পরিবর্তন করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسْ، فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ
‘তোমাদের কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রাগ করলে বসে পড়ুক। রাগ না কমলে শুয়ে পড়ুক।’ (আবু দাউদ ৪৭৮২)
৩️. অজু করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَإِنَّ الشَّيْطَانَ خُلِقَ مِنَ النَّارِ، وَإِنَّمَا تُطْفَأُ النَّارُ بِالْمَاءِ، فَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَوَضَّأْ
‘রাগ শয়তান থেকে আসে, শয়তান আগুন থেকে সৃষ্টি; আর আগুন পানি দিয়ে নেভানো হয়। তাই তোমাদের কেউ রাগ করলে সে যেন অজু করে।’ (আবু দাউদ ৪৭৮৪)
৪. শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া
এক ব্যক্তি রেগে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
‘আমি আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।’ (বুখারি ৩২৮২, মুসলিম ২৬১০)
৫️. ক্ষমা করার অভ্যাস করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا
‘ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ বান্দার সম্মানই বাড়ান।’ (মুসলিম ২৫৮৮)
সুতরা যে ব্যক্তি রাগ সংবরণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে দান করবেন জান্নাতি হুর। হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ، دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ
‘যে ব্যক্তি তার রাগ প্রয়োগে ক্ষমতা থাকার সত্ত্বেও সংযত থাকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সকল সৃষ্টিকূলের মধ্যে থেকে ডেকে নেবেন এবং তাকে হুরদের মধ্য থেকে তার পছন্দমত যে কোনো একজনকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেবেন।’ (আবু দাউদ ৪৭৭৭)
রাগ দমন করা সহজ নয়, কিন্তু এটি ইমানের সৌন্দর্য। রাগের সময় যে নিজেকে সংযত রাখতে পারে— সে শুধু মানুষকে নয়, আল্লাহকেও খুশি করে। এক মুহূর্ত চুপ থাকা, একটু পানি দিয়ে অজু করা, অবস্থান বদলানো কিংবা আল্লাহর নাম স্মরণ করা—এই ছোট আমলগুলোই বড় গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
আসুন, আমরা রাগকে আমাদের চরিত্রের অধিপতি না বানিয়ে— রাগের ওপর ইমানের শাসন কায়েম করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাগ সংযম করার তৌফিক দিন এবং উত্তম চরিত্রে ভূষিত করুন। আমিন।
