মাত্র ১২০ টাকার সরকারি ফিতে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি পেয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে নেত্রকোণার ৪২টি প্রান্তিক পরিবার। স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নির্বাচিত হয়েছেন এসব তরুণ-তরুণী।
‘সেবার ব্রতে চাকরি’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে রোববার রাত সাড়ে ১০টায় নেত্রকোণা জেলা পুলিশ লাইন্স ড্রিল শেডে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ও নেত্রকোণার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিতদের নাম প্রকাশ করেন।
কোনো ধরনের তদবির, ঘুষ বা দালালচক্রের প্রভাব ছাড়াই সম্পন্ন হওয়া এ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা ও তাদের পরিবার। ফলাফল ঘোষণার পর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচিত ৪২ জনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
চূড়ান্ত তালিকায় নাম উঠে আসার পর আবেগে ভেঙে পড়েন অনেকেই। নির্বাচিতদের বেশিরভাগই কৃষক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। একসময় যেখানে পুলিশের চাকরি মানেই লাখ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ শোনা যেত, সেখানে মাত্র ১২০ টাকায় চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের জন্য ছিল অবিশ্বাস্য।
এবারের নিয়োগে সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের। নেত্রকোণা সরকারি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা কামরুল দীর্ঘ ১১ বছর ধরে মা-বাবাহীন জীবন পার করেছেন। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করা। আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার কঠিন চাপে সেই স্বপ্ন অনেকটা অধরাই মনে হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের মেধা ও যোগ্যতার জোরে চাকরি পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
প্রতিক্রিয়ায় কামরুল বলেন, তিনি এতিমখানায় বড় হয়েছেন এবং ছোটবেলা থেকেই পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নিয়োগের মাধ্যমে চাকরি পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
একইভাবে সংগ্রামের গল্প রয়েছে বারহাট্টা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের আরিফা আক্তারের জীবনেও। কৃষক বাবার সংসারে বড় হওয়া আরিফা আর্থিক সংকটের মধ্যেও স্বপ্ন ছাড়েননি। টানা দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পরও বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় তিনি আবার প্রস্তুতি নেন। অবশেষে তৃতীয় চেষ্টায় সফল হয়ে পুলিশে চাকরি পান।
আরিফা জানান, ছোটবেলা থেকেই দেশের সেবা করার ইচ্ছা ছিল তার। আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যেও কোনো ঘুষ ছাড়াই নিজের যোগ্যতায় চাকরি পাওয়ায় তিনি গর্বিত ও আনন্দিত।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি-২০২৬ ব্যাচের নিয়োগের জন্য অনলাইন আবেদন গ্রহণ করা হয় গত ৫ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। নেত্রকোণা জেলা থেকে মোট ৩ হাজার ১০৮ জন প্রার্থী আবেদন করেন।
পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে কয়েক ধাপে শারীরিক পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে কাগজপত্র যাচাই ও শারীরিক মাপে উত্তীর্ণ হন ১ হাজার ৫৫১ জন। এরপর ফিজিক্যাল এনডুরেন্স টেস্টে ৮৩৭ জন এবং দৌড়, ড্র্যাগিং ও রোপ ক্লাইম্বিং শেষে ৪৭২ জন প্রার্থী প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন।
এরপর লিখিত পরীক্ষার জন্য ৪৬৯ জন আবেদন করেন এবং ৪ মে নেত্রকোণার আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেওয়া ৪৬৩ জনের মধ্যে ১১৭ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৭ মে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। সব ধাপ শেষে মেধাক্রম ও কোটা অনুযায়ী মোট ৪২ জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
ফলাফল ঘোষণার সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় পুলিশ লাইন্সে। একদিকে নির্বাচিতদের চোখে আনন্দের অশ্রু, অন্যদিকে অল্পের জন্য বাদ পড়াদের হতাশা—সব মিলিয়ে ছিল অনুভূতির এক ভিন্ন আবহ।
এ সময় পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম নির্বাচিতদের উদ্দেশ্যে বলেন, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা এ পর্যন্ত এসেছে এবং এখন সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।
যারা নির্বাচিত হতে পারেননি, তাদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আবার চেষ্টা করলে তারাও ভালো অবস্থানে যেতে পারবেন।
ফলাফল ঘোষণার সময় নিয়োগ বোর্ডের সদস্য শেরপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা এবং ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মাহফুজা খাতুন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও নেত্রকোণা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
দিনভর পুলিশ লাইন্সের বাইরে অপেক্ষা করেন প্রার্থীদের স্বজনরা। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নির্বাচিতদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আলিঙ্গন ও কান্নায় ভরে ওঠে পুরো এলাকা। সফলতার আনন্দে আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দেয় সেই দৃশ্য।
