দেশে প্রায় এক দশক ধরে চালু থাকা অ্যাপভিত্তিক রাইডশেয়ারিং সেবার আওতা থেকে সিএনজি অটোরিকশা বাদ দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যাত্রী, চালক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা। তাদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যাত্রী নিরাপত্তা, চালকদের আয়, ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থা এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মে রাইডশেয়ারিং সেবার অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নীতিগতভাবে রাইডশেয়ারিং নীতিমালা থেকে অ্যাপভিত্তিক সিএনজি অটোরিকশা সেবা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এ সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাইডশেয়ারিং সেবা চালু হয়। শুরুতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হলেও পরে অ্যাপভিত্তিক সিএনজি অটোরিকশাও যুক্ত হয়। স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে সেবাটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৮টি রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সেবা দিচ্ছে এবং প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীরা আগাম ভাড়া জানতে, চালকের পরিচয় যাচাই করতে, জিপিএসের মাধ্যমে যাত্রাপথ অনুসরণ করতে এবং যাত্রার ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীরা আবার প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। এতে ভাড়া নিয়ে বিরোধ বাড়তে পারে, নিরাপত্তা কমতে পারে এবং যাত্রার ডিজিটাল ট্র্যাকিং সুবিধাও হারিয়ে যাবে।
রাইডশেয়ারিং খাত শুধু নগর পরিবহন সহজ করেনি, কর্মসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত এক দশকে হাজারো চালক এ খাতে পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন পেশা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যারেজ, জ্বালানি, বীমা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, ডিজিটাল পেমেন্ট ও কাস্টমার সাপোর্টসহ বিভিন্ন খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী সাফায়েত হোসেন বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা নিরাপদ ও সুবিধাজনক। চালকের পরিচয় এবং যাত্রার তথ্য সংরক্ষিত থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও নিশ্চিন্ত থাকা যায়।
বিদেশপ্রবাসী মো. সিদ্দিকের মতে, দেশে এলে তিনি নিয়মিত অ্যাপভিত্তিক সিএনজি ব্যবহার করেন। তাঁর ভাষায়, স্বল্প দূরত্বে এটি নিরাপদ ও কার্যকর একটি সেবা, তাই এটি বন্ধ না করে আরও উন্নত করা উচিত।
রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার অ্যাপভিত্তিক সিএনজি চালক মো. হামিদ জানান, অ্যাপ চালুর পর নিয়মিত যাত্রী পাওয়া যায়, ফলে সময় বাঁচে এবং আয়ও বেড়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মতিঝিলের চালক শামসুলও। তিনি বলেন, অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া আগেই নির্ধারিত থাকায় যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কের সুযোগ কমে যায়।
রাইড শেয়ারিং অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের আহ্বায়ক এবং ওভাই সলিউশন লিমিটেড (এমজিএইচ গ্রুপ)-এর অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর সৈয়দ ফখরুউদ্দিন মিল্লাত বলেন, অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা যাত্রীদের নিরাপদ, স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করেছে। জিপিএস ট্র্যাকিং ও যাচাইকৃত চালকের তথ্য যাত্রীদের আস্থা বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের এ সেবা বন্ধ করে দিলে মানুষ আবার অনিয়ন্ত্রিত ও কম নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালে বিআরটিএ নিজেই ‘রাইডশেয়ারিং এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’-এর আওতায় অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা পরিচালনার সুযোগ দেয়। তাই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিআরটিএ, রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠান, চালক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানো উচিত।
খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, যাত্রী নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থ বিবেচনায় অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা নীতিমালা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সব অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
