উজানের ভারি বৃষ্টিপাত এবং বর্ষা মৌসুমের প্রভাবে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।
সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সারদার উদয় রায়হান বলেন, জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রতিবছর জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশে বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময় দেশের প্রধান নদীগুলোর উজান ও অববাহিকায় ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তিনি জানান, চলতি বছরও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি পেলে বন্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বর্ষার মধ্যবর্তী সময়েই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বন্যাগুলো সংঘটিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে অতিবৃষ্টির কারণে দেশের প্রায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ ভূখণ্ড পানিতে তলিয়ে যায়।
এরপর ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা টানা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ী ছিল। ওই দুর্যোগে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় তিন কোটি মানুষ পানিবন্দি বা বাস্তুচ্যুত হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীতে একই সময়ে উচ্চ প্রবাহ তৈরি হলে বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। ২০০৪ সালে এমন পরিস্থিতির কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও বড় ধরনের বন্যার নজির রয়েছে। ২০২২ সালে মেঘনা অববাহিকার বন্যা এবং ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় মিলিয়ে এক কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনা উজানের অতিবৃষ্টির প্রভাব ও ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।
সারদার উদয় রায়হান জানান, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে উপকূলীয় নদীগুলোর ক্ষেত্রে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া যায় প্রায় তিন দিন আগে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত রয়েছে। তবে আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে উজানে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মেঘনা অববাহিকার অবস্থাও স্বাভাবিক থাকার আশা করা হচ্ছে।
এদিকে চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। এর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এফএফডব্লিউসির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ব্যবস্থার পানির স্তর কিছুটা কমেছে। তবে আগামী চার দিনে আবারও পানি বাড়তে পারে এবং পঞ্চম দিনে তা স্থিতিশীল থাকতে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৪ থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি বা সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। ফলে এসব জেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আগামী পাঁচ দিনে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির স্তর বাড়লেও তা বিপৎসীমার নিচেই থাকবে বলে জানিয়েছে এফএফডব্লিউসি।
এ ছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা (উচ্চ মেঘনা) নদীর পানি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্কসীমা স্পর্শ করতে পারে। এতে সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে নীলফামারীর ডালিয়া, লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর তারাপুর পয়েন্ট, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, সুনামগঞ্জের মারকুলি এলাকায় কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি নিজ নিজ সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
