দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করার ক্ষেত্রে কর-ভ্যাট সংক্রান্ত জটিলতা, উচ্চ সুদহার, বন্দরে পণ্য খালাস এবং নিবন্ধন সমস্যাসহ বিনিয়োগে বাধা দূর করতে দুই বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের মন্ত্রী ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে প্রাইভেট সেক্টর অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল। এ কাউন্সিলে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং দেশের উৎপাদন খাতের ৯ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার, প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, এপেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর, বে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান, প্রাণ আরএফএল গ্রুপের সিইও আহসান খান চৌধুরী, ইনসেপ্টা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মোক্তাদির, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান, র্যাংগস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী এবং এসিআইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আরিফ দৌলা।
বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা হচ্ছে, সংকট আছে, সেগুলো দূর করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা তাদের কথা বলেছেন। অনেক কিছুর সমাধান হয়েছে। আবার অনেক কিছু ‘পেন্ডিং’ আছে, সেগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে।
বিনিয়োগ নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের বাধা কোথায় পাচ্ছেন, এগুলোর সমাধান উনি (প্রধানমন্ত্রী) করতে চান, শিগগির করতে চান। ব্যবসায়ীদের কাছে সমস্যার কথা শুনেছেন এবং কিছু কিছুর সমাধান অন দ্য স্পট দিয়েছেন। বাকিগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান দেওয়া হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, বৈঠকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের সরকারি সহায়তার কথা বলেন তারা। ব্যবসায়ীরা বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য ই-ভিসা চালুর দাবি জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের ঝামেলা ছাড়াই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে যাতে বাংলাদেশে আসতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো, এনবিআর সংস্কার এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তারা। মাঝারি উদ্যোক্তাদের রপ্তানিতে উৎসাহিত করতে লাইসেন্সপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং আমদানি-রপ্তানি ও বাণিজ্যে গতি আনতে গভীর সমুদ্রবন্দর চালুর আহ্বানও তারা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের কী কী সংকট আছে, সেসব বিষয় প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের নানা সংকটের কথা বিগত দিনে আমরা শুনে এসেছি, প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের মুখ থেকে তাদের সমস্যার কথা শুনতে চেয়েছিলেন। তাদের কথাগুলোর একটা নোট নেওয়া হয়েছে। অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, অনেক পেন্ডিং আছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
বন্ধ কলকারখানা চালুর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এগুলো কীভাবে চালু করা যায়; সরকারি কারখানা যেগুলো বন্ধ হয়েছে, সেগুলো কীভাবে আবার শুরু করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সার্বিকভাবে নতুন প্রকল্পের বাইরে যেসব পুরোনো প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে, এগুলো চালু করার জন্য আলোচনা হয়েছে এবং এগুলার সমাধান দিয়ে আমরা আশা করি অনেক প্রকল্প চালু করা হবে। জ্বালানি সহায়তার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, মাল্টিলেটারাল বডিগুলো থেকে বিভিন্ন সহায়তা আসছে। আমরা সবার সহযোগিতা পাচ্ছি মাল্টিলেটারাল বডিগুলো থেকে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো শুনেছেন। আমরা ব্যবসার নিবন্ধন ও নবায়ন সংক্রান্ত জটিলতা এবং এনবিআরের ভ্যাট, কাস্টমস ও আয়কর বিষয়ে ব্যবসার প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেছি। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, ব্যাংকের উচ্চ সুদহার, ইকোনমিক জোনের ইউটিলিটি ও জমিসংক্রান্ত সমস্যাগুলো জানানো হয়েছে। বৈঠকে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নিজেদের দেশে কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে ওষুধ শিল্পের এপিআই, অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর, এগ্রো-প্রসেসিং এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকের ফল সম্পর্কে ওই উদ্যোক্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী সব সমস্যা ধৈর্য ধরে শুনেছেন এবং কিছু বিষয় তাৎক্ষণিক (ইনস্ট্যান্ট) সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ছাড়া কিছু বিষয়ে তিনি নোট নিয়েছেন, যা পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে। নবগঠিত অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের বৈঠক প্রতি তিন মাস অন্তর অনুষ্ঠিত হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এ কাউন্সিল বিনিয়োগের সব বাধা দূর করবে।
