ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে দেশের জ্বালানি সংকট। তেল সংগ্রহের আশায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মধ্যরাত থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন ভোক্তারা। জ্বালানির অভাবে নগর জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, আর গ্রামাঞ্চলেও দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং আমদানিনির্ভরতার উচ্চমাত্রাই এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে। ফলে জ্বালানি খাত নিয়ন্ত্রণে আনা বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অতীতের পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অর্থপাচারসহ সামষ্টিক অর্থনীতির চাপও এই সংকটকে তীব্রতর করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা, শিল্প-কারখানা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে তেলের বড় অংশ আমদানি করা হয়। গত ১৪ মাসে ২০ দশমিক ৬৯ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়েছে, যার অধিকাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় কনডেনসেট থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেট্রোল উৎপাদন সত্ত্বেও বাজারে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের প্রকৃত ঘাটতি থাকলেও পেট্রোল সংকটের পেছনে কৃত্রিম সংকট ও অসাধু চক্রের ভূমিকা থাকতে পারে।
সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতে। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। অনেক এলাকায় সীমিত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের কারণে জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও জ্বালানি সংকটে হুমকির মুখে পড়েছে। জেনারেটর চালাতে ডিজেল সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা। এতে সময়মতো রফতানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি কাঁচামাল সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মজুত তেল বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিশ্বের তেল উৎপাদনের বড় অংশই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে যে কোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে—যার প্রতিফলন এখন বাংলাদেশেও স্পষ্ট।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া অফিস সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ, সন্ধ্যার পর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে বহুমুখী জ্বালানি উৎসের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তাই চলমান সংকটকে সামনে রেখে টেকসই ও বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
