কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি শিক্ষা ও পেশাজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও এর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে স্বাধীন চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং মৌলিক সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন নীতিমালা গ্রহণ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসরুমে ল্যাপটপ, স্মার্টফোনসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ক্লাসরুমে নিষিদ্ধ সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নতুন নয়। তবে এবার ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো-এর ল স্কুল। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে ল্যাপটপ, স্মার্টফোনসহ কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন না।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, এআই যুগে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী সক্ষমতা এবং মৌলিক আইনি দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেন নেওয়া হলো এই সিদ্ধান্ত?
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে একজন দক্ষ আইনজীবীর জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলী গড়ে তোলাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
ল স্কুলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার্থীরা যেন এআইয়ের ওপর ভরসা না করে স্বকীয়তা, কৌশলগত চিন্তা এবং গভীর ও স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখে, তা নিশ্চিত করতেই আমাদের এই পদক্ষেপ।’
পরিবর্তন আসছে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও
শুধু ক্লাসরুমেই নয়, পরীক্ষা ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা ক্লাসরুমের ভেতরেই অনুষ্ঠিত হবে এবং পরীক্ষার সময় ইন্টারনেট, কোনো ইলেকট্রনিক ফাইল কিংবা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
ভবিষ্যতে এই নীতিতে পরিবর্তন হতে পারে
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই নীতিমালা ভবিষ্যতে পুনর্মূল্যায়ন, পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা হতে পারে।
তাদের ভাষায়, ‘প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল। ফলে বর্তমান নিয়মগুলো প্রযুক্তি ও আইনি পেশার বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে পরিবর্তন করা হতে পারে।’
এআই নিষিদ্ধ, তবে শেখানো হবে দায়িত্বশীল ব্যবহার
বিশ্ববিদ্যালয় এটিও স্বীকার করেছে যে, বর্তমান সময়ে আইনি পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এ কারণে ক্লাসে এআই ব্যবহার সীমিত করা হলেও পাঠ্যক্রমের নির্দিষ্ট অংশে শিক্ষার্থীদের এআই প্রযুক্তি শেখানো হবে, যাতে ভবিষ্যতে তারা পেশাগত জীবনে এই প্রযুক্তি দায়িত্বশীল, কার্যকর এবং নৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
আইন পেশা এখন এআইয়ের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি
চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ও অটোমেশনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে আইন অন্যতম। ‘এআই এক্সপোজার ইনডেক্স’-এর ওই গবেষণায় আইন পেশাকে শতভাগ ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আইন পেশার অনেক জ্ঞানভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী কাজ এখন এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব।
ইতোমধ্যেই আদালতের প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে এআই আইনজীবী
এদিকে, গত মাসে যুক্তরাজ্যের একটি এআইভিত্তিক ল ফার্ম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সফল মামলার প্রস্তুতিতে এআই আইনজীবী ব্যবহার করে নতুন নজির স্থাপন করেছে। ‘গারফিল্ড এআই’ নামের প্রতিষ্ঠানটি সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি সংগ্রহ এবং ট্রায়ালের প্রস্তুতির কাজে তাদের এআই আইনজীবীকে ব্যবহার করে। পরে একজন মানব ব্যারিস্টার আদালতে মামলাটি পরিচালনা করেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ ইয়ং লিংকডইনে লিখেছেন, ‘মানুষের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একজন এআই আইনজীবীর জয়ে এটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ট্রায়াল। এটি সবার জন্য আইনি সহায়তা আরও সহজলভ্য করার পথে নতুন যুগের সূচনা।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত শিক্ষা ও আইনি পেশার বাস্তবতা বদলে দিচ্ছে। একদিকে এআই কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীন চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং মৌলিক দক্ষতা ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে আনছে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ল স্কুলের এই সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্য রক্ষারই একটি প্রচেষ্টা। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক বিচারবোধ ও সৃজনশীল চিন্তাশক্তি বিকাশই যে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এই উদ্যোগ যেন সেটিই স্মরণ করিয়ে দেয়।
