বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপি সরকার ঘোষণা করেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। যার মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটের তুলনায় যা প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার কঠিন এক চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতে রেকর্ড পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। অবশ্য আরও ১৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ রয়েছে এডিপিবহির্ভূত।
প্রস্তাবিত বাজেটে এজন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। এজন্য কর্মসংস্থান, বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। একদিকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। তবে অতি ধনীদের সম্পদের ওপর সম্পদ করারোপের চিন্তা থেকে সরে এসেছে সরকার। এ ছাড়া বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদার করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবার। যুক্ত হয়েছে অর্থনীতির নতুন ধারণা সৃজনশীল অর্থনীতি। এ ধারণার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয় পরিচালন খাতে। আগামী অর্থবছর পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয়ে ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বরাবরের মতোই অন্যতম বড় খাত হিসেবে থাকছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরপরই বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। সড়ক, সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় হবে। কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষক কার্ড, কৃষি ভর্তুকি এবং খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়নে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। পানিসম্পদ খাতে খাল খনন, নদী পুনরুদ্ধার এবং বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।
মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বাজার-চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা এবং স্টার্টআপ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে স্টার্টআপের টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর অব্যাহতির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক আয় দেশে আনলেই এ সুবিধা পাওয়া যাবে।
আগামী পাঁচ বছরে জিডিপিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫জি সেবা সম্প্রসারণ, উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান। আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আগামী অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের প্রকৃত আদায় ছিল মাত্র তিন লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সংস্থাটির রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হয়।
বাজেটের সাফল্য কখনোই তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই একটি বাজেটের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি ও প্রযুক্তিপণ্যে কর হ্রাস দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের উদ্যোগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে সহায়ক হবে। স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও ই-বাইক উৎপাদনে শুল্ক ও ভ্যাট সুবিধা এবং ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও সময়োপযোগী। তবে প্লাস্টিক পণ্যে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ১০ শতাংশে উন্নীত করা স্থানীয় শিল্পের জন্য নেতিবাচক।
বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে সিঙ্গল উইন্ডো বাধ্যতামূলক করা, ওয়ার্ক পারমিট সাত দিনে ও বিনিয়োগকারী ভিসা ১০ দিনে প্রদান, বিদেশি ঋণের সুদে উৎস কর ১০ শতাংশে হ্রাস এবং উৎস কর কর্তনজনিত ব্যয় অগ্রহণযোগ্যতার বিধান বাতিল কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি, নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর হ্রাস এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক আমদানিতে কর শূন্য করা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তবে নতুন কূপ খননের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে যদি সুনির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো না থাকে, তবে স্বল্পমেয়াদি ভর্তুকি বিনিয়োগের পরিবর্তে শুধু অপচয়ই বাড়াবে। তাই স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি মূল্য কাঠামো প্রণয়নের জন্য আহবান জানাচ্ছি।
লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গোল্ড বেল কর্পোরেশন।
